আপনি হয়তো সম্পূর্ণ সুস্থ অনুভব করছেন। কোনো দুর্বলতা নেই, অতিরিক্ত তৃষ্ণা নেই, ঘন ঘন প্রস্রাবও হচ্ছে না। তারপরও আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
এই অবস্থাকেই বলা হয় প্রি-ডায়াবেটিস (Prediabetes)।
প্রি-ডায়াবেটিস মানেই যে আপনার ডায়াবেটিস হয়ে গেছে, তা নয়। বরং এটি এমন একটি সতর্ক সংকেত, যখন রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু এখনও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছেনি।
ভালো খবর হলো—এই পর্যায়ে বিষয়টি শনাক্ত করতে পারলে জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রি-ডায়াবেটিস কী?
আমরা যখন খাবার খাই, তখন খাবারের একটি অংশ গ্লুকোজে পরিণত হয়ে রক্তে প্রবেশ করে। ইনসুলিন নামের একটি হরমোন এই গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে, যেখানে এটি শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু শরীর যখন ইনসুলিনের প্রতি আগের মতো ভালোভাবে সাড়া দেয় না, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ধীরে ধীরে বেড়ে যেতে পারে।
রক্তে শর্করা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও যখন তা ডায়াবেটিসের নির্ধারিত সীমায় পৌঁছায় না, তখন এই অবস্থাকে প্রি-ডায়াবেটিস বলা হয়।
American Diabetes Association-এর ২০২৬ সালের মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রি-ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে HbA1c সাধারণত ৫.৭–৬.৪%, অথবা fasting plasma glucose ১০০–১২৫ mg/dL (৫.৬–৬.৯ mmol/L) হতে পারে।
সমস্যা হলো—অনেকেরই কোনো লক্ষণ থাকে না
প্রি-ডায়াবেটিসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি অনেক সময় সম্পূর্ণ লক্ষণবিহীন থাকে।
অর্থাৎ আপনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন, কাজ করছেন, খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন—কিন্তু ভেতরে ভেতরে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে শুরু করেছে।
তাই শুধু লক্ষণের জন্য অপেক্ষা করলে প্রি-ডায়াবেটিস শনাক্ত করার সুযোগ হারিয়ে যেতে পারে।
কার ঝুঁকি বেশি?
কিছু বিষয় প্রি-ডায়াবেটিস ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশেষ করে ঝুঁকি বেশি হতে পারে যদি—
- আপনার ওজন বেশি থাকে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি থাকে
- বাবা-মা বা ভাইবোনের ডায়াবেটিস থাকে
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করেন
- উচ্চ রক্তচাপ থাকে
- HDL বা “ভালো” কোলেস্টেরল কম অথবা triglyceride বেশি থাকে
- Polycystic Ovary Syndrome বা PCOS থাকে
- আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়ে থাকে
- দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও sedentary lifestyle থাকে
Asian ancestry-এর মানুষের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম BMI-তেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়। ADA-এর ২০২৬ নির্দেশনায় Asian ancestry-এর ক্ষেত্রে BMI ২৩ kg/m² বা তার বেশি এবং সঙ্গে অন্যান্য risk factor থাকলে screening বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
কীভাবে বুঝবেন আপনার প্রি-ডায়াবেটিস আছে কি না?
শুধু শরীরের অনুভূতি দিয়ে প্রি-ডায়াবেটিস নিশ্চিত করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন রক্ত পরীক্ষা।
১. HbA1c
HbA1c গত প্রায় ২–৩ মাসে আপনার রক্তের গড় শর্করার একটি ধারণা দেয়।
সাধারণভাবে:
স্বাভাবিক: ৫.৭%-এর নিচে
প্রি-ডায়াবেটিস: ৫.৭–৬.৪%
ডায়াবেটিস: ৬.৫% বা তার বেশি
২. Fasting Plasma Glucose
সাধারণত অন্তত ৮ ঘণ্টা না খেয়ে এই পরীক্ষা করা হয়।
স্বাভাবিক: ১০০ mg/dL-এর নিচে
প্রি-ডায়াবেটিস: ১০০–১২৫ mg/dL
ডায়াবেটিস: ১২৬ mg/dL বা তার বেশি
প্রয়োজনে চিকিৎসক Oral Glucose Tolerance Test (OGTT)-ও করতে বলতে পারেন। একটি অস্বাভাবিক রিপোর্ট দেখেই নিজের থেকে ডায়াবেটিস ধরে নেওয়া উচিত নয়; বিশেষ করে স্পষ্ট উপসর্গ না থাকলে diagnosis নিশ্চিত করতে repeat বা confirmatory testing প্রয়োজন হতে পারে।
প্রি-ডায়াবেটিস ধরা পড়লে কী করবেন?
প্রি-ডায়াবেটিসকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখুন—এখনও পরিবর্তন আনার সময় আছে।
১. প্রতিদিন শরীরকে সক্রিয় রাখুন
হাঁটা দিয়ে শুরু করাই যথেষ্ট হতে পারে।
লক্ষ্য রাখতে পারেন সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত brisk walking, cycling, swimming বা অন্য কোনো শারীরিক কার্যক্রম করার।
একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও কমানোর চেষ্টা করুন।
২. মিষ্টি পানীয় কমিয়ে দিন
Soft drinks, energy drinks, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত চা-কফি, packaged juice বা অন্যান্য sugary drinks নিয়মিত খেলে অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি ও চিনি দ্রুত শরীরে প্রবেশ করে।
পানি, চিনি ছাড়া চা অথবা কম চিনিযুক্ত পানীয় বেছে নেওয়া ভালো অভ্যাস হতে পারে।
৩. ভাত একেবারে বন্ধ নয়—portion-এর দিকে নজর দিন
বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে অনেকের প্রথম প্রশ্ন হয়—
“তাহলে কি ভাত খাওয়া বন্ধ করতে হবে?”
সাধারণত প্রয়োজন নেই।
বরং পুরো খাবারের পরিমাণ এবং balance-এর দিকে নজর দিন।
প্লেটের একটি বড় অংশ শাকসবজি, সঙ্গে পর্যাপ্ত protein এবং পরিমিত ভাত বা অন্য carbohydrate রাখার চেষ্টা করতে পারেন।
একসঙ্গে খুব বেশি সাদা ভাত, মিষ্টি, মিষ্টি পানীয় ও refined carbohydrate খাওয়ার অভ্যাস কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ওজন বেশি থাকলে ধীরে ধীরে কমানোর চেষ্টা করুন
বিশেষ করে পেটের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি insulin resistance-এর সঙ্গে সম্পর্কিত।
Crash diet করার পরিবর্তে এমন খাবার ও ব্যায়ামের পরিকল্পনা করুন যা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব।
৫. ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনকেও গুরুত্ব দিন
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, stress management এবং দৈনন্দিন শারীরিক কার্যকলাপ—সবই একটি স্বাস্থ্যকর metabolic lifestyle-এর অংশ।
শুধু “চিনি না খাওয়া” দিয়েই ডায়াবেটিস প্রতিরোধের পুরো বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না।
কতদিন পর আবার পরীক্ষা করা প্রয়োজন?
প্রি-ডায়াবেটিস ধরা পড়লে নিয়মিত follow-up গুরুত্বপূর্ণ। ADA-এর ২০২৬ নির্দেশনায় prediabetes থাকা ব্যক্তিদের সাধারণত প্রতি বছর diabetes testing করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বেশি হলে চিকিৎসক আরও আগে পরীক্ষা করতে বলতে পারেন।
শেষ কথা
প্রি-ডায়াবেটিস কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়—এটি শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, অনেক মানুষ জানতেই পারেন না যে তাদের রক্তে শর্করা ইতিমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি।
তাই আপনার যদি পারিবারিকভাবে ডায়াবেটিসের ইতিহাস থাকে, ওজন বেশি থাকে, শারীরিক পরিশ্রম কম হয়, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্যান্য risk factor থাকে—তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে Fasting Blood Glucose বা HbA1c পরীক্ষা করার বিষয়ে আলোচনা করুন।
ডায়াবেটিস হওয়ার অপেক্ষা নয়—ঝুঁকিটা আগে জানুন।
ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর পদক্ষেপই ভবিষ্যতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
BetterStepsBD.com
ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর পদক্ষেপ, বড় পরিবর্তনের পথে।
Disclaimer: এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। আপনার পরীক্ষার ফলাফল, স্বাস্থ্যগত সমস্যা বা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে চিকিৎসক বা যোগ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর পরামর্শ নিন।