২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ এবং জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ থেকে দেশে হাজার হাজার সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। (World Health Organization)
হামকে অনেকেই সাধারণ জ্বর ও র্যাশের রোগ মনে করলেও বাস্তবে এটি বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি এবং নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis), অন্ধত্ব, অপুষ্টি এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। (UNICEF)
হাম কী?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসের মাধ্যমে ছড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাম এতটাই সংক্রামক যে একজন আক্রান্ত ব্যক্তি একটি অসুরক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১২–১৮ জন পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তি একটি কক্ষ ত্যাগ করার পরও ভাইরাস বাতাসে কিছু সময় সক্রিয় থাকতে পারে। (Wikipedia)
কেন বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে যে ২০২৬ সালের মার্চ-এপ্রিল সময়কালে বাংলাদেশে ১৯,০০০-এরও বেশি সন্দেহভাজন এবং প্রায় ৩,০০০ নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগীই ছিল ৫ বছরের কম বয়সী শিশু। (World Health Organization)
ইউনিসেফ এবং WHO-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় অনেক শিশু সুরক্ষাবিহীন থেকে গেছে, যা এই প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। (UNICEF)
হামের লক্ষণ
সংক্রমণের ৭–১৪ দিন পর সাধারণত লক্ষণ শুরু হয়।
প্রাথমিক লক্ষণ:
- উচ্চ জ্বর
- কাশি
- নাক দিয়ে পানি পড়া
- চোখ লাল হওয়া
- দুর্বলতা
পরবর্তী লক্ষণ:
- মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik spots)
- মুখ থেকে শুরু হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া লাল র্যাশ
কোন শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে?
গবেষণা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে:
- ৫ বছরের কম বয়সী শিশু
- ৯ মাসের কম বয়সী শিশু
- অপুষ্ট শিশু
- যাদের টিকা সম্পূর্ণ হয়নি
- দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮০% ছিল ৫ বছরের কম বয়সী। (Infection, Disease & Health)
হামের জটিলতা
হাম শুধুমাত্র র্যাশের রোগ নয়।
সম্ভাব্য জটিলতা:
১. নিউমোনিয়া
হাম-সম্পর্কিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
২. মারাত্মক ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
৩. কানের সংক্রমণ
৪. মস্তিষ্কের প্রদাহ (Encephalitis)
৫. অপুষ্টি বৃদ্ধি
৬. বিরল ক্ষেত্রে মৃত্যু
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, অপুষ্ট ও টিকাবিহীন শিশুদের মধ্যে জটিলতা এবং মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। (World Health Organization)
আপনার শিশুকে সুরক্ষিত রাখার ৫টি বৈজ্ঞানিক উপায়
১. সময়মতো MR/MMR টিকা দিন
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
দুই ডোজ টিকা প্রায় ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা দিতে পারে। (Wikipedia)
২. টিকা মিস হয়ে গেলে দ্রুত পূরণ করুন
অনেক শিশুর টিকা বিভিন্ন কারণে বাদ পড়েছে।
আপনার সন্তানের টিকা কার্ড আজই পরীক্ষা করুন।
৩. জ্বর ও র্যাশকে অবহেলা করবেন না
জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৪. পুষ্টি ও ভিটামিন A নিশ্চিত করুন
ভিটামিন A জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং WHO-এর সুপারিশকৃত চিকিৎসার অংশ। (Reuters)
৫. আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রচলিত ভুল ধারণা
❌ “হাম হলে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়”
❌ “এক ডোজ টিকাই যথেষ্ট”
❌ “শুধু শিশুদেরই হাম হয়”
❌ “হাম হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার দরকার নেই”
এসব ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য হামের প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। অধিকাংশ গুরুতর রোগী এবং মৃত্যুর ঘটনা দেখা যাচ্ছে টিকাবিহীন বা আংশিক টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে। গবেষণা ও জনস্বাস্থ্য তথ্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে সময়মতো টিকাদানই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা। (World Health Organization)
আজই আপনার সন্তানের টিকা কার্ড পরীক্ষা করুন। একটি টিকা আপনার শিশুকে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ এবং জীবনহানিকর জটিলতা থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক: Dr. Reazul Islam Rafi
সূত্র: WHO, UNICEF, Lancet, International Journal of Infectious Diseases, DGHS Bangladesh
